রিপন হোসেন সাজু,মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি।। আধুনিক যান্ত্রিক যুগে বিদ্যুৎবিহীন জীবন অনেকটা স্বামী/স্ত্রী বিয়োগের যন্ত্রনার সামিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। যদিও সৃষ্টিকর্তা এধরনের পরিস্থিতে আমাকে ফেলে নাই, তথাপিও অত্যান্ত কাছের থেকে লাইফ পার্টনার বিহীন নর-নারীর জীবন জীবিকা দেখে অনেকটা অনুমেয়। জীবন সঙ্গীহীন মানুষটি যেন বিকলঙ্গ হয়ে কোন রকম জােড়াতালি দিয়ে নিত্য সময়কে পার করে থাকে।
আধুনিক সভ্যতার এ যুগে বিদ্যুৎবিহীন জীবন তাই অনেকটা সঙ্গীহীন জীবনের সাথে যদি তুলনা করা হয় তবে যারপর নাই অসামঞ্জস্য কিছু হবে না বৈকি। আমাদের সেকেলে জীবন যাত্রার সাথে বর্তমান জীবন যাত্রার কোন মিল নেই। সব কিছুতেই আমুল পরিবর্তন হয়েছে। শহর আর গ্রামের জীবনযাত্রা এখন প্রায় একই। এক সময় শহরে ছিলো সর্ব দিক দিয়ে আধুনিক সুযোগ সুবিধা। গ্রামে তার সামান্য কোন ছােয়া ছিলো না।
আধুনিক সভ্যতার এই যান্ত্রিক যুগে শহর আর গ্রামের তফাৎটাকে কমিয়ে এনেছে তার অন্যতম সোফান হলো গ্রাম পর্যায়ে বিদ্যুতায়ন। বিদ্যুৎ আমাদের সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের সুখ-সাচ্ছন্দ এমনকি ভোগ-বিলাসের এমন এক জায়গায় পৌছিয়ে দিয়েছেন যে বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের এখন এক মুহুর্ত যেন চলেই না। হোক না সে শহর আর গ্রাম। সর্বত্রই এখন দেখা যায় লাল-নীল বৈদ্যুতিক বাতি। এই বিদ্যুতের চাহিদা এবং ব্যবহারের ব্যাপকতা এখন সর্বোচ্চ।
বাসা-বাড়ির কথায় বলি..এখানে বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান, ইলেক্ট্রনিক সব সামগ্রী যেমন: রেডিও, টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, ট্যাব, ল্যাবট্যাব,মোবাইল, ইলেক্ট্রনিক নানান ডিভাইজ, ক্যালকুলেটর, ঘড়ি, চার্জার লাইট,আইপিএস, ইউপিএস, যতসব সাউন্ড সিষ্টেমের সমাগ্রী, রেকর্ডার, টাইম কিপার, থার্মফ্লাক্স, ডিস এন্টেনা, রেফ্রিজারেটর, ওয়াটার কুলার ও হিটার, ওয়াটার সাপ্লাই, কারি কুকার, রাইস কুকার,ব্রেড কুকার, বৈদ্যুতিক চুলা, শরবত তৈরির মেসিনারিস, ক্লোথ আইরন, ক্লোথ ওয়াশিং
ম্যাসিন, পোশাক প্রস্তুত মেসিনারিজ,বিভিন্ন খেলনা সমাগ্রী, হেয়ার হিটার, কৃষি ক্ষেত্রে.. সেচ যন্ত্র, ক্রপ কাটিং এন্ড প্রসেসিং মেসিন, বিদ্যুৎ চালিত বিভিন্ন ধরনের যানবহন, শিক্ষা উপকরন,শরীরচর্চা সামগ্রী, চিকিৎসা সামগ্রীসহ বহুবিধ খাতে আমরা বিদ্যুতের সুবিধা গ্রহণ করে আসছি। কিন্তু আমাদের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সময়োপযোগী না হওয়ায় যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বহুল ব্যবহারিত আমাদের বিদ্যুৎ খাতকে চরম নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়।
আমাদের গ্রামীন অবকাঠামো ও বৃক্ষরাজিতে ভরপুর পরিবেশের মধ্যে নির্মান করা হয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন। সাব এরিয়াল পরিবেশে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে তার ঝুলিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে দেওয়া হয়েছে বৈদ্যুতিক সংযোগ। বছরে সিংহভাগ সময় এ সংযোগে তেমন একটা বিভ্রাট ঘটে না। তবে বসন্ত,গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে ঝড় ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের গ্রামীন জনপদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
গেল বুধবার(২০ মে) রাতে প্রলংকরী সাইক্লোন আম্ফান লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে এই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে। যপবিস-২(মণিরামপুর) এই অফিসের আওতায় গোটা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রায় দু’ই দিন ধরে অচল হয়ে পড়ে। বহু চেষ্টা করে মণিরামপুর পৌর এলাকার অংশ বিশেষ দুই দিনের মাথায় বিদ্যুৎ চালু করে অতঃপর অন্যান্য এলাকায় চালুর জন্য নিরলস কাজ করছে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগ। যপবিস-জিএম অরুন কুমার কুন্ডুর দেওয়া তথ্য মতে দেড় হাজার কর্মী গোটা এলাকায় বিদ্যুতের পুন: সংযোগ দেয়ার কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে।
তথাপিও সিংহভাগ এলাকায় এখনও সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমার এলাকায় আজও সচল হয়নি বিদ্যুৎ লাইন। ফলে বিদ্যুৎ বিহীন এ জনপদের মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা থমকে গেছে। প্রচন্ড গরমে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। নির্ঘুম মানুষের সীমাহীন কষ্ট! পাশাপাশি আধুনিক জীবন যাত্রার সকল উপকরন অচল হয়ে যাওয়ায় কারও কোন কাজে স্বস্থি নেই।
জায়া ও পতির বিরহ বেদনার ন্যায় বিদ্যুৎ বিহীন জীবনে মানুষের এক সীমাহীন দুর্ভোগ যেন স্বামী-স্ত্রী বিয়োগের যে অভাব তথা সমস্যা হয়, এমনটিই সবার মাঝে পরিলক্ষিত হয়েছে। তাই সচেতন মহল বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থাকে টেকসই ও আধুনিক করতে ভূগর্ভস্থ্য লাইন নির্মানের পক্ষে জোরালো মতামত দিয়েছেন।